খুলনার বার্তা ডেস্ক:
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের বিতর্ক মঞ্চে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। দীর্ঘদিন পর একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সরকারের প্রধান হিসেবে বিশ্বমঞ্চে ভাষণ দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশ্বায়নের টানাপোড়েন, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং পরিবেশগত জলবায়ু ঝুঁকির এই সংকটময় মুহূর্তে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে তিনি তুলে ধরলেন এক প্রজ্ঞাপূর্ণ, ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের রোডম্যাপ।
‘সমঝোতামূলক বিশ্ব সমাজ’ (Consensual World Order) প্রতিষ্ঠার আহ্বানে প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণ কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বক্তৃতার সীমানায় আবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন এবং টেকসই বিশ্বশান্তি বিনির্মাণে বহুপাক্ষিক কূটনীতির এক দূরদর্শী রাজনৈতিক ও সামাজিক ইশতেহার। বিশ্বমঞ্চে তার প্রথম আন্তর্জাতিক বক্তব্য হিসেবে ভাষণে যে পরিপক্কতা, প্রজ্ঞা ও জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের স্থানকে এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত করেছে। ভাষণের অন্যতম একটি আবেগঘন ও সুদূরপ্রসারী দিক ছিল ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার পুনরুজ্জীবন। বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে স্মৃতিকাতর প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করেন তার বাবা স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নাম; যারা অতীতে এই জাতিসংঘ মঞ্চ থেকেই বাংলা ভাষার প্রতিধ্বনি তুলে ধরেছিলেন। এই পারিবারিক ঐতিহ্য কেবল ব্যক্তিগত আবেগের বিষয় নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌম কূটনীতির ধারার সাথে বর্তমান নেতৃত্বের একটি নিরবচ্ছিন্ন সংযোগের বার্তা বহন করে। অতীতে যেভাবে দেশের স্বার্থ ও বহুপাক্ষিকতার নীতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল, বর্তমান নেতৃত্বও সেই পথ ধরেই বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর। একই সাথে, ভাষণের সূচনাতেই ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে প্রধানমন্ত্রী এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা স্বৈরাচারী ও শাসন-শোষণের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ আজ পূর্ণাঙ্গভাবে মুক্ত ও গণতান্ত্রিক। চলতি বছরের ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সুসংগঠিত জাতীয় নির্বাচনে জনগণের রায়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করার তথ্য জাতিসংঘে পেশ করার মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, এই দেশের মূল চালিকাশক্তি হলো তার জনগণ। ‘জনগণই ক্ষমতার উৎস’—এই দর্শনে বিশ্বাসী এক নতুন বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে বিশ্ব মানচিত্রে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যতের গতিপথ সম্পর্কে সুদৃঢ় আস্থা প্রদান করে। পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী বহুপাক্ষিকতা ও সার্বভৌম সমতার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছেন। বিশ্বায়নের এই যুগে যেকোনো প্রান্তে ঘটা সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাব যে সব দেশের ওপরই পড়ে, তা তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। যুদ্ধ ও অস্ত্রের প্রয়োগ নয়, বরং কূটনৈতিক আলোচনা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই সব সংকটের সমাধান হওয়া উচিত বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নয়ন খাতের বাজেট কমিয়ে সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর প্রবণতাকে বিশ্বশান্তির জন্য বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশ আণবিক নিরস্ত্রীকরণ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণের প্রতি তার অবিচল অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবদান, পিসবিল্ডিং কমিশনে সক্রিয় ভূমিকা এবং বিশেষ করে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি নারীদের সাহসী ভূমিকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ঐতিহাসিক ও অবিচল সমর্থনের কথা বিশ্বমঞ্চে আবারও তুলে ধরে বাংলাদেশ তার নীতিভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির পরিচয় অক্ষুণ্ণ রেখেছে। দীর্ঘ ৯ বছর ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ার মানবিক দৃষ্টান্ত তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী এই সংকটের টেকসই সমাধানের দিকে বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিতে গিয়ে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জীবনযাত্রার ওপর যে তীব্র চাপের সৃষ্টি হয়েছে, তা বিশ্বনেতাদের কাছে স্পষ্ট করা হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত—এই স্পষ্ট মন্তব্য তুলে ধরে তিনি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সমাজকে আহ্বান জানিয়েছেন যেন বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ ভূমিতে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা হয়। একই সাথে প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আকুল আবেদন জানানোর পাশাপাশি বিচারহীনতার সংস্কৃতি যেন এই সংকটকে আরও ঘনীভূত না করে, সে বিষয়ে বৈশ্বিক শক্তিগুলোকে তিনি সতর্ক করেছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও দৃশ্যমান। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের ভূমিকা নগণ্য হওয়া সত্ত্বেও জলবায়ু ঝুঁকির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী কোনো পরমুখাপেক্ষী করুণার আবেদন জানাননি; বরং জোর দাবি জানিয়েছেন ‘ক্লাইমেট জাস্টিস’ বা জলবায়ু ন্যায়ের। আসন্ন COP-31 সম্মেলনে অভিযোজন তহবিল ও ক্লাইমেট ফাইন্যান্সিং জোরদারের আহ্বানের পাশাপাশি দেশীয় পরিবেশ সুরক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, ২০,০০০ কিলোমিটার খাল খনন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা, পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়ন এবং ১৯৯২ সালের আন্তর্জাতিক ওয়াটার কনভেনশনে স্বাক্ষরের মতো বৈপ্লবিক পদক্ষেপগুলোর কথা তুলে ধরা হয়েছে, যা প্রমাণ করে বাংলাদেশ কেবল অনুদানের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং পরিবেশ সুরক্ষায় নিজস্ব উদ্যোগেও নেতৃত্ব দিতে সক্ষম। দেশের অভ্যন্তরীণ শাসনযন্ত্র ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে সরকার যে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নিয়ে এগোচ্ছে, ভাষণে তার বৈজ্ঞানিক রূপ ফুটে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী দেশের এই সংকট কাটিয়ে উঠতে দুর্নীতি ও পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারপূর্বক স্থিতিশীলতা আনার লক্ষ্যে ‘রিকভারি’, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো চালু করতে ‘রিস্টোরেশন’ এবং অবকাঠামো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দেশ গড়ার ‘রিকনস্ট্রাকশন’—এই ৩-আর স্ট্র্যাটেজিক মডেল বাস্তবায়নের কথা ঘোষণা করেছেন। ভাষণে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, শুধু পলিটিক্যাল ডেমোক্রেসি বা ভোটের অধিকার নয়, বাংলাদেশ এখন ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন’ নিশ্চিতে বিশ্বাসী, যাতে উন্নয়নের সুফল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিটি ঘরের দোরগোড়ায় পৌঁছায়। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে বিশ্ব যখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও বায়ো-টেকনোলজির মতো চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চূড়ায় আরোহণ করছে, তখন প্রধানমন্ত্রী এক গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বলেছেন, আজকের ডিজিটাল বিভাজন যেন আগামী দিনের এআই-বিভাজনে রূপ না নেয়। বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করে বাংলাদেশকে বিশ্বমানের ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য বাস্তবায়নে উন্নত প্রযুক্তি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং গবেষণার সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০ মিলিয়ন ডলারের স্টার্ট-আপ ফান্ড বরাদ্দ, কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এআই-এর ইতিবাচক ব্যবহারে জাতিসংঘের কার্যকর নীতিমালার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সাথে জাতিসংঘের Sustainable Development Goals (SDG)-এর ‘Leave No One Behind’ ভাবনার সাথে সরকারের ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচির সমন্বয়ের উল্লেখ প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের সাথে গভীরভাবে সংহতিপূর্ণ। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী হওয়ায় নারীদের আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের মূলধারায় রাখা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, ই-হেলথ কার্ড এবং স্পোর্টস কার্ড প্রবর্তনের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনার উদ্যোগ এবং পরবর্তীতে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’-এ রূপান্তরের রূপরেখা জাতিসংঘে প্রশংসিত হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড পরিবারের নারী প্রধানের নামে ইস্যু করে নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদাকে সরাসরি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। যুব সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে স্টার্ট-আপ ফান্ড বরাদ্দ এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে অভূতপূর্ব বাজেট বৃদ্ধি নির্দেশ করে যে বাংলাদেশ কেবল ঐতিহ্যবাহী অর্থনীতির ওপর নির্ভর করে থাকতে চায় না, বরং জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তি চালিত একটি স্বনির্ভর অর্থনীতির দিকে দ্রুত ধাবিত হচ্ছে। পরিশেষে, ‘সবার আগে বাংলাদেশ: সবার জন্য বাংলাদেশ’—এই উদার ও জাতীয়তাবাদী দর্শনে ভর করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, আত্মমর্যাদাশীল ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ঘোষণা দিয়েছেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া তার এই প্রথম বক্তব্য কেবল একটি প্রথাগত রাজনৈতিক ভাষণ ছিল না; বরং এটি ছিল ভূ-রাজনৈতিক সংকটে আলোচনার টেবিলকে প্রাধান্য দেওয়া, জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, রোহিঙ্গা সমস্যার মূল উৎসে হাত দেওয়া এবং দেশে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার এক পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা। বিশ্বমঞ্চে এই ভাষণ নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি পুনর্নির্মাণে ও কূটনৈতিক অবস্থান সুসংহত করতে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকবে ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন। লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, ‘আমার দিন’। ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com
